
উত্তর কোরিয়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য দুই তলাবিশিষ্ট একটি নতুন কেন্দ্র তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। জাতিসংঘের এই পারমাণবিক নজরদারি সংস্থার প্রধান উত্তর কোরিয়ার এই পদক্ষেপকে গভীর উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
নবনির্মিত এই ভবন উত্তর কোরিয়ার প্রধান পরমাণু কমপ্লেক্স ইয়ংবিয়নের অংশ। আইএইএ বলেছে, ভবনটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজে ব্যবহৃত ২৮টি সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেড বসানোর সক্ষমতা রয়েছে।
গত মাসের শেষের দিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আইএইএ বলেছে, পিয়ংইয়ং অন্য একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে নতুন সম্প্রসারিত ভবনের কার্যক্রমও শুরু করেছে।
পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, এসব তথ্য প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই উত্তর কোরিয়া ক্রমাগত পরমাণু অবকাঠামো সম্প্রসারণ করে চলেছে। ২০০৯ সালে পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের বহিষ্কার করার পর থেকে উত্তর কোরিয়ায় সংস্থাটির সরাসরি কোনও উপস্থিতি নেই। যে কারণে স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবির ওপর ভিত্তি করেই তাদের এই মূল্যায়ন করতে হচ্ছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে এক বিবৃতিতে আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির এই ধারাবাহিকতা ও নতুন অগ্রগতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবগুলোর স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
আইএইএ চলতি বছরের জুনে প্রথমবারের মতো এই ভবনের অস্তিত্বের কথা প্রকাশ করে। যদিও গ্রোসি বছরের শুরুর দিকেই এমন এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
সংস্থাটি বলেছে, গত ৩ জুন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন একটি নবনির্মিত পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন কারখানা পরিদর্শনে যান; যা মূলত ইয়ংবিয়ন সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শনকালে দেশের অভূতপূর্ব উৎপাদন সক্ষমতায় সন্তোষ প্রকাশ করেন কিম। তিনি বলেন, এটি আরও বড় ধরনের সামরিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ সুগম করবে।
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার গোপন পারমাণবিক অস্ত্রাগার গড়ে তুলতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন। আন্তর্জাতিক এক অলাভজনক পারমাণবিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে দেশটির বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৬৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এডওয়ার্ড হাওয়েল বিবিসিকে বলেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের বহু স্থাপনার কথা বিশ্ববাসীর অজানা এবং তা অত্যন্ত গোপনে পরিচালনা করা হয়। ফলে সেগুলোকে চিহ্নিত করা বা লক্ষ্যবস্তু বানানো কঠিন।
তিনি বলেন, ইয়ংবিয়নের বাইরেও কাংসনের মতো অন্যান্য স্থানে পরমাণু স্থাপনা রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতির সঙ্গে তাদের পারমাণবিক অবস্থান এতটাই গভীরভাবে জড়িত যে সামনে এমন আরও গোপন উৎপাদন কেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
জাতিসংঘের ওই সংস্থা বলেছে, রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের কাছে কাংসনে অবস্থিত অপর একটি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই কাজ শুরুর প্রমাণ মিলেছে। ২০২৪ সালেই কাংসনে একটি অতিরিক্ত ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল।
এর আগে, গত এপ্রিলে আইএইএ সতর্ক করে বলেছিল, উত্তর কোরিয়া পরমাণু বোমা তৈরির সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে এবং ইয়ংবিয়নের সার্বিক সম্প্রসারণের ওপর নজর রাখছে।
কিম জং উনের শাসনামলে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দ্রুত ত্বরান্বিত হয়েছে। তিনি রেকর্ড সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা তদারকি করেছেন। ২০১৭ সালে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পরীক্ষা শুরু করার পর থেকে দেশটি একাধিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উৎক্ষেপণ করেছে।
উত্তর কোরিয়া এ পর্যন্ত মোট ছয়টি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে; যার সর্বশেষটি হয়েছিল ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে।
চলতি বছরের আগস্টে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে উত্তর কোরিয়াকে আলোচনার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, এই আলোচনা উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতার বিস্তার কার্যকরভাবে বন্ধ করার উপায় খুঁজে বের করার বড় মাধ্যম হতে পারে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার এই প্রস্তাবে উত্তর কোরিয়া এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
সূত্র: বিবিসি।